Posts

জঞ্জাল

সেদিনটা ভেবে আবার চোখের কোনটা জ্বালা করে উঠল। আর কিছুক্ষণই বাকি ছিল, প্রচন্ড বেগে ছুটে আসবে ট্রেনটা - দূরপাল্লার একটা এক্সপ্রেস। রেললাইনের দশফুট দূরে দাঁড়িয়ে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল শেষ সময়ের চিন্তাগুলো - আর তো মাত্র কয়েকটা মিনিট, তারপরই এই নশ্বর দেহ তালগোল পাকিয়ে জঞ্জাল হয়ে যাবে। একরাশ ঘৃণা, কিছুটা বিরক্তি আর হয়তো অল্প করুণা মিশিয়ে লোকজন বলবে, "কেন? কি হয়েছিল?" কয়েকটা ঘরে, বন্ধুদের আড্ডায় আর নিউজপেপারে স্থায়ী জায়গা হবে দুদিনের জন্য। বাবা, মা, আর হয়তো অনেক দূরে বসে থাকা ওই মেয়েটা নীরবে দু ফোঁটা চোখের জল ফেলবে; কিন্তু বিশ্বাস ছিল, এই শেষ - আর কখনো ওই চোখের জলের দাবী জানাবো না। নাহ, পারিনি সেদিন; ট্রেনটা এসে চলেও গিয়েছিল। তারপর আরো বহুবার রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়েছি, বহু ট্রেন এল গেল, একই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেল। তবু আজও একইভাবে রয়ে গেছি, আজও আমি ব্যর্থ হই, ওদের চোখে জল আসে, সান্ত্বনা দেয়, বলে নতুন করে শুরু করতে; পুরো জীবনটাই গেছে কেমন তালগোল পাকিয়ে, ব্যর্থতা-অনুতাপ-সান্ত্বনা আর আবার নতুন করে বাঁচা - নতুন করে ব্যর্থ হওয়ার জন্য; বৃত্তাকারে ঘুরে চলেছে আমা...

একটি কবিতা, দাদার ডায়েরি থেকে

বুঝতে পারলে কিন্তু আকাশটা বদলাত না, কিংবা নক্ষত্রর আলোও যেত না নিভে। শুধু স্বপ্নটা বদলে যেত, বোঝা না বোঝার জটিল গ্রাফটা আমার মাথায় ঢোকে না, শুধু স্বপ্ন বদলের দিনলিপিটুকু বুঝি, বুঝতে পারলে সময়ের বিচ্ছিরি মারপ্যাঁচে কেউ পড়ত না, শুধু আমি বদলে যেতাম।  আকাশটা বদলায় বলেই সে এত সুন্দর, নয়ত একঘেয়ে আকাশের বুকে যদি নক্ষত্ররা জ্বলেই রইত, তবে স্বপ্নটাতেও মরচে পড়ত না কি? মানছি তোমার স্বপ্নটা ইস্পাতের নয়, পেঁজা তুলোর হলেও - স্বপ্ন তো একটাই, বদলে গেলে স্বপ্ন যে আর স্বপ্ন থাকে না, কাজেই সন্ধ্যাতারার চুরি যাওয়া আলোয় হলেও একটাই স্বপ্ন দেখো।

আশা

চৈতী বিকেল, কালবোশেখী দমকা বেগে, নিঝুম ধরায় আমিই বুঝি একলা জেগে; ফিরছে দেখো পাখির দল ওই আপন নীড়ে- হঠাৎ কিরম হিংসে হল ওদের দেখে। জানিস কেন? ওরাও বাঁচে বন্ধু সাথে, একলা আমিই একলা থাকি দিন বা রাতে; তুই ছিলি মোর একলা দিনের জীবনসাথী, আজ বেভুলে নেই সেই হাত আমার হাতে। ভুল করেছি? ভুলের মাশুল জীবনভর গুনব আমি, ভুলব সবই আপনপর। চাই যে শুধু বাঁচব আবার নতুন করে, সব ভুলে আজ, বাঁধবি সাথে নতুন ঘর?

চলা

সাগরমাঝে ছোট্ট একটা দ্বীপ, যেন রূপকথারই সবপেয়েছির দেশ - স্বপ্নালু চোখে চাই, আনন্দ খুঁজি হেন, চাই না তো কোনো দুঃখ-কষ্ট-ক্লেশ। খুঁজে ফিরি সেই সুখ; যদি জোটে, বুঝেও বুঝি না, জীবন সেথা থেমে - দিনগুলো সব ছদ্মসুখেরই বটে, মুক্তি খুঁজি অগাধ জলে নেমে। দূরপানেতে ভাসছে দেখি তরী, আমার মতই লক্ষ্যহারা বুঝি; সাঁতরে গিয়ে আঁকড়ে তাকে ধরি, একসাথেতে সুখের হদিশ খুঁজি। সেই যে শুরু, তিনটি বছর পার; চলছি তবু, হর্ষ সদাই মনে, জীবনতরী বাইব জীবনভর - ঝঞ্ঝা যতই আসুক ঈশানকোণে।

কথোপকথন নাকি খিচুড়ি

রোববারের সকাল। সাতটার দিকে হঠাৎ কোনো এক অজানা কারণে ঘুমটা চটকে গেল। অবশ্য তাতে খুব বেশি কিছু এল-গেল না। মানে এই পি-এইচ-ডি -এর জীবনে রবি-সোম সবই একরকম। অগাধ সময় পাওয়া যায়, কিন্তু করব করব করে আর কিছুই করা হয়ে ওঠে না। এমনকি আমার তো এ সন্দেহও হয় মাঝে মাঝে যে আদৌ শেষ অবধি ডিগ্রীটা পাব তো! যাকগে, ঘুমটা যখন ভেঙেই গেল, অহেতুক সময় নষ্ট না করে কিছু কাজের কাজ করবই, এই ভেবে বেজায় উৎসাহ নিয়ে উঠে পড়লাম। ফ্রেশ হয়ে এক কাপ চা বানিয়ে কি করি কি করি ভাবতে ভাবতে অভ্যাসবশে ল্যাপটপটা অন করে ফেলেছি, তখনই দুম করে আইডিয়াটা মাথায় চলে এল। অনেকদিন ব্লগটায় লেখা হয়নি, আজ বরং একটা কিছু লিখে ফেলা যাক। তো মেল-টেল চেক করে চুপ করে বসে ভাবছি কি লিখব, এমন সময় - 'পিড়িং'। মানে ওই আর কি - কেউ একটা এই সাতসকালে চ্যাট করে সময় কাটাতে চায়। খুলে দেখি, আমার এক দূরসম্পর্কের দাদা, যার সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তার আবার সদ্য বিয়ে হয়েছে, মানে একটু বেশি বয়সেই। আর বিয়ের পর থেকেই, জানি না কেন, এই দাম্পত্যজীবন নিয়ে আমার কাছে নানা পরামর্শ চায়। বস্তুত, বিয়ের পর থেকে অন্য কিছু নিয়ে আর কথা বলেই না আজকাল। আজও সেরকমই কিছু হবে ...

একা

মাঝরাত্তিরে একলা সাথী কফির কাপে ধোঁওয়া; আবছা আঁধার তোকেই খোঁজে - মনখারাপের ছোঁওয়া। তুষারপাতের ঠান্ডা হাওয়ায় বাজছে করুণ সুর - আজকে বড়ই অবুঝ স্মৃতি; তোর নেশাতেই চুর। রাত কিবা দিন শুধু তুইময়, তোর চিন্তায় মগ্ন; আজ তবু ঘরে একা বসে রই আমি, কফি আর স্বপ্ন।

শীত

শিশির জমে ঘাসের 'পরে, মলিন রঙের খেলা, শরত বলে, 'আর দেরী নয়, এবার যাওয়ার পালা।' গাছের পাতা লুটায় ভূমে, শুষ্ক হলো ধরা; শীতের কবল হঠাৎ দেখি নাড়ছে দোরে কড়া। স্মৃতির পটে উঠল ভেসে - শীত মানে তো আয়েস, পৌষপাবণে পিঠের সাথে খেজুর গুড়ের পায়েস; শীত মানে তো মায়ের হাতে গরম কাপড় বোনা, খাবার পাতে নিত্যনতুন সবজি আনাগোনা। শীতের ভোরে সবাই মিলে বনভোজনে দূরে, শীত মানে যে সরস্বতী - অঞ্জলি এক সুরে। আজ এখানে শীতটা আছে, হারিয়ে গেল বাকি, এগিয়ে চলার ছদ্মসুখে জীবন দিল ফাঁকি। সতেজ মধুর সেই শৈত্য, স্বপ্নসুখে গাঁথা; তুষারপাতে হাঁটছি একা - শুষ্ক মলিন হেথা।